ভারত-পাকিস্তান সংঘাত

চীনা পুঁজিবাজারে প্রতিরক্ষা খাতের সূচকে ঊর্ধ্বগতি

ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে।

ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। হামলার শুরুতেই চীনা অস্ত্র ব্যবহার করে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে ইসলামাবাদ, যা কিনা চীনের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে চীনা প্রতিরক্ষা খাতে শেয়ারদর গত দুদিন হুহু করে বেড়েছে। অন্যদিকে সংঘাতের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পুঁজিবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। অবশ্য গতকাল পুনরুদ্ধারের গতি ছিল লক্ষণীয়। খবর সিএনবিসি।

ভারতের বিমানবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পাকিস্তান জে-১০সি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছিল বলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে বুধবার জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। মূলত এ মন্তব্য চীনে বিনিয়োগ আস্থাকে প্রভাবিত করে।

প্রতিবেদন অনুসারে, যুদ্ধবিমানটির নির্মাতা চীনা রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এভিআইসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এভিআইসি চেংদু এয়ারক্রাফট। কোম্পানিটির অন্য সহযোগী এভিআইসি অ্যারোস্পেস তৈরি করে সামরিক বিমান ও হেলিকপ্টার। ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংসের পর হংকংয়ে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। এছাড়া শেনজেন-তালিকাভুক্ত এভিআইসি চেংদু এয়ারক্রাফটের শেয়ারদর বাড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি দামে লেনদেন হচ্ছিল। আগের দিন শেয়ারদর বাড়ে ১৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা গত অক্টোবরের পর সবচেয়ে বড় ঊর্ধ্বগতি।

এছাড়া সামরিক ও বেসামরিক জাহাজ নির্মাতা চায়না স্টেট শিপ বিল্ডিং করপোরেশনের শেয়ারদর বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ।

চীনা প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ার সূচক বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সহকারী গবেষক ইয়াং ঝি বলেন, ‘চীনা অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা পাকিস্তান, যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌযান ও ড্রোন।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ সংঘর্ষ প্রমাণ করেছে চীনা অস্ত্রের মান ভালো। বিশেষ করে পাকিস্তানে যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পারফরম্যান্স ভারতের ব্যবহৃত ফরাসি ও সোভিয়েত যুগের যুদ্ধবিমানের তুলনায় ভালো ছিল।’

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে, ২০২০-২৪ সালের মধ্যে চীনের মোট অস্ত্র রফতানির ৬০ শতাংশেরও বেশি গিয়েছে পাকিস্তানে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম স্ট্র্যাটেজির কৌশলবিদ ডেভিড রোচের মতে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বাড়লে পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ করবে চীন। যুদ্ধ সরঞ্জাম ধ্বংস হলেও প্রতিস্থাপন করবে বেইজিং। সম্ভবত এ ধারণার কারণে চীনা প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ার সূচকে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, পাকিস্তান সীমান্তে ভারতীয় পাঁচটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এ দাবিকে ‘অপপ্রচার’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে নয়াদিল্লি।

ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসের তথ্যানুসারে, পাকিস্তান ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৫১ সালে। শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইসলামাবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগী হয়ে ওঠে বেইজিং। মার্কিন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান সেথ জোনস জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সামরিক সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে জানান, পুঁজিবাজারের এ ঊর্ধ্বগতি হয়তো সাময়িক। সেথ জোনস আরো যোগ করেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই উত্তেজনা কমাতে চায়। তবে বিষয়টি এখন পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করছে। পাকিস্তান আরো প্রতিক্রিয়া দেখাতে চায় কিনা বা ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস করাটাই তাদের বিজয়ের জন্য যথেষ্ট সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

এদিকে দ্য হিন্দু জানিয়েছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও শক্তিশালী বিদেশী বিনিয়োগের মধ্যেও গতকাল সকালে ভারতীয় পুঁজিবাজারের প্রবণতা ছিল মিশ্র। এ সময় সেনসেক্স সূচক কমে দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। এছাড়া নিফটি সূচক কমে দশমিক ১৩ শতাংশ। বুধবার ভোরের আগে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানে হামলার পর দিনের লেনদেনে সতর্কতা দেখা যায়। তবে বাজার প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে মৃদু ছিল।

এছাড়া ভারতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা (এফআইআই) ক্রয় অব্যাহত রেখেছেন। ‍বুধবার আড়াই হাজার কোটি রুপির বেশি লগ্নি হয়েছে, যা ২০২০ সালের পর টানা ১৫ দিনের সবচেয়ে দীর্ঘ ক্রয় ধারা; চারদিনে প্রায় ১০ হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ এসেছে। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার এখন ‘দিশাহীন’ অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি অনুসারে বাজারে ঊর্ধ্ব বা নিম্নমুখী ধারা দেখা যেতে পারে।

এদিকে অপারেশন সিঁদুরের ধস কাটিয়ে উঠেছে করাচি শেয়ারবাজার। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুসারে, বুধবার ৬ হাজার ৫০০ পয়েন্ট পতনের পর গতকাল কিছুটার পুনরুদ্ধার হয়েছে পাকিস্তানের শেয়ারবাজার। বুধবার ছিল বাজারের জন্য খারাপ একটি দিন। এদিন কেএসই-১০০ সূচক প্রায় ৬ শতাংশ পড়ে যায়, যা ২০২১ সালের পর সবচেয়ে বড় একদিনের পতন। তবে বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি বদলে যায়। দিনের শুরুতে সূচক দশমিক ২৬ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

২০২৪ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত পাকিস্তানের কেএসই-১০০ সূচক ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ধারা। তবে যুদ্ধ আতঙ্কে গত ১০ দিনে এ অর্জন অনেকটাই মুছে গেছে। নয় কর্মদিবসে সূচকের ৪ দশমিক ১ শতাংশ পতন ঘটে। গতকাল দিনের শুরুতে পুনরুদ্ধারের পরও কেএসই-১০০ সূচক বছর শুরুর তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ নিচে ছিল।

আরও